নিউজ ডেস্ক:
১৯৬০ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে কর্ণফুলী নদীতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্টি হয় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠাপানির কৃত্রিম হ্রদ কাপ্তাই হ্রদ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি এই হ্রদ বর্তমানে একটি বিশাল মৎস্য ভান্ডারে পরিণত হয়েছে, যেখান থেকে সরকার প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে।
প্রথমদিকে কাপ্তাই হ্রদের মাছ স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করা হতো। তবে ধীরে ধীরে এই হ্রদের মাছের চাহিদা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছেছে। বর্তমানে হ্রদের মাছ বিশেষ করে ছোট মাছ কাচকি ও চাপিলা আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সীমার্ক, বিডিফুড, মাসুদ ফিশ, আনরাজ ফ্যাক্টরিসহ দেশের বিভিন্ন মৎস্যকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান স্থানীয় জেলেদের কাছ থেকে এসব ছোট মাছ সংগ্রহ করে আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে রপ্তানি করছে মধ্যপ্রাচ্য, লন্ডনসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে। সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিনিধি দলও কাপ্তাই হ্রদের কাচকি ও চাপিলা আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, কাপ্তাই হ্রদকেন্দ্রিক মাছের বিদেশি বাণিজ্যের পরিমাণ ইতোমধ্যে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। শুধু রাঙামাটি থেকেই প্রতিদিন প্রায় তিন মেট্রিক টন মাছ বিদেশে রপ্তানির জন্য পাঠানো হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা। জেলেদের ধরা মাছ প্রথমে মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) ঘাটে রাজস্ব প্রদান শেষে বাছাই ও প্যাকিং করা হয়, এরপর চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানার মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি হয়।
রাঙামাটি বিএফডিসি ঘাটের ব্যবসায়ী মো. বুলবুল হোসেন বলেন,
“একসময় হ্রদে কার্প জাতীয় বড় মাছের আধিক্য থাকলেও তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে। ফলে ছোট মাছের আধিক্য বেড়েছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো—এই ছোট মাছ দিনদিন বিদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং রপ্তানির বাজারে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।”
এদিকে বিএফডিসি ঘাটের ব্যবসায়ীদের ম্যানেজার মো. জাহিদুল ইসলাম জানান,
“প্রতিদিন ১৫–২০ লাখ টাকার ছোট মাছ রপ্তানির জন্য বিক্রি হয়। তবে এখানকার ব্যবসায়ীরা সরাসরি বিদেশে রপ্তানি করতে পারে না। বাইরের কোম্পানিগুলো মাছ কিনে বিশেষ প্যাকেজিং করে বিদেশে পাঠায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সরাসরি রপ্তানির সুযোগ পেলে আরও বেশি লাভবান হতো।”
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় রাঙামাটিতে প্রসেসিং ফ্যাক্টরি স্থাপন করা গেলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, স্থানীয়রা সরাসরি রপ্তানিতে অংশ নিতে পারবে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) রাঙামাটি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে রপ্তানিযোগ্য আট প্রজাতির মাছের চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—বড় আইড়, সাদা টেংড়া, বাঁচা, কাজরী, কাচকি, বাঁশপাতা, ছোট আইড় ও বাতাসী। গত ২৪–২৫ বাণিজ্যিক বছরে এসব প্রজাতির ৩৩ লাখ ২০ হাজার ৩০৪ কেজি মাছ ঘাটে অবতরণ হয়েছে, যার বিপরীতে সরকার রাজস্ব আদায় করেছে ৮ কোটি ১০ লাখ ৭৪ হাজার ৩৮৬ টাকা।
বিএফডিসি রাঙামাটি কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক কমান্ডার (নৌবাহিনী) মো. ফয়েজ আল করিম বলেন,
“সার্বিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদেশে রপ্তানিযোগ্য মাছের বাজার হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এটি আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সংবাদ। একই সঙ্গে মাছের প্রজনন বাড়াতে বিএফডিসি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।”