নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাওয়া’র ‘সমস্যা সংকুল পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তির অন্বেষণ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান
পাহাড়ে ষড়যন্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাস মোকাবিলায় সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করে রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন হলে সেখানে সেনা ক্যাম্প বাড়িয়ে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিও বাড়াতে হবে। বিষয়টা কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নয়, বরং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের একটি ভূরাজনৈতিক আগ্রাসন হিসেবেই মনে করছেন সাবেক ঊর্ধ্বতন সামরিক সেনা কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সাংবাদিক, গবেষক ও বিশিষ্টজনেরা।
৮ অক্টোবর বুধবার রাজধানীর মহাখালীতে রাওয়া হেলমেট হলে ‘সমস্যা সংকুল পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তির অন্বেষণ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এ বিষয়ে আরো বলেছেন, পার্বত্যাঞ্চলে সেনা উপস্থিতির কারণেই সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা এখনো বজায় রয়েছে। রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া) এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মেজর জেনারেল (অব.) কামরুজ্জামান। বক্তব্য রাখেন রাওয়া চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) আবদুল হক, সাবেক বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাবেক বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) আকবর ফজলে এলাহী, মেজর জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর করিব তালুকদার, বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মানিষ দেওয়ান চাকমা, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, পার্বত্যনিউজের সম্পাদক ও সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান পলাশ, সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের সমন্বয়ক ইঞ্জিনিয়ার থোয়াইং চিং মং শাক প্রমূখ।
রাওয়া চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) আবদুল হক বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪০০ জনের মতো শহীদ হয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য। আমরা তাদের রুহের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা দীর্ঘদিনের, আজকের নতুন কোনো সমস্যা নয় এবং অংশটুকু বাংলাদেশের ভবিষ্যতে রাখা যাবে কিনা সন্দেহ আছে। আন্তর্জাতিক চক্রান্তের শিকার এটা স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, দেশের শত্রুদের চক্রান্ত তারা করতেই থাকবে, ভবিষ্যতেও করবে। কিন্তু সেটা থেকে বাঁচার জন্য যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, আমাদের জাতীয় ঐক্য, শান্তি প্রতিষ্ঠা। এই সকল বিষয়ে দল-মত, বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে একত্রিত হতে হবে। আজকে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সেনাবাহিনী এককভাবে ভূমিকা রেখে তারা অনেকেই এখানে উপস্থিত। যাদের জীবন যৌবন সেখানে বিসর্জন দিয়েছেন। তারা ওখানে অনেকেই আছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ আর্মির অবদান উল্লেখ করে এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন বলেন, আমি ১৯৮০ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে সাত বছর ফ্লাইং করেছি। তখন আমি দেখেছি বাংলাদেশ আর্মি পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা বজায় রাখতে কত প্রাণ দিয়েছে। সে কারণে এখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি অংশ হিসেবে রয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা তখন ৪০০ ক্যাম্পে ফ্লাইং করেছি। সেই ক্যাম্পের সংখ্যা কোথায় নেমে এসেছে। আমি দেখেছি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সহ অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীর লেফটেন্যান্ট ক্যাপ্টেনদের যে ধরনের কমিটমেন্ট ছিল এখন সেই কমিটমেন্ট আছে কিনা আমি জানি না। আগে পাহাড়ের যে ইতিহাস আমাদের পড়ানো হতো সেই ইতিহাস প্রেক্ষাপট এখনো পড়ানো হয় কিনা জানি না। এগুলো দেখার বিষয় আছে। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ১৯৮০ সাল অথবা ১৯৯০-এর দিকে যে ব্যবস্থাপনা ছিল সেই অর্ডার এস্টাবলিশ করতে হবে। নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে তাদেরকে বোঝাতে হবে। তাহলে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো কোনো ষড়যন্ত্র করতে পারবে না। পার্বত্য অঞ্চলে আমাদের যে বাঙালিরা আছে তাদের মধ্যেও তেমন নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারেনি। সেটা গড়ে তুলতে হবে। অনেকেই অনেক কথা বলবেন, আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চাই, আর্মির উপস্থিতি চাই না, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম স্পেশাল প্লেস। এখানে আর্মির কারণেই সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা এখনো বজায় রয়েছে।
মেজর জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর করিব তালুকদার বলেন, পাহাড়িদের মধ্যে নেতৃত্বের সংকট রয়েছে। পাহাড়ে গুজব ছড়ায় ইউপিডিএফ এবং পার্শ্ববর্তী দেশ। গণমাধ্যমে একপেশে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। পাহাড়ে কিছু হলে না বুঝে না জেনে একদল বুদ্ধিজীবী বিবৃতি দিতে শুরু করেন। শান্তি চুক্তি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, এটা পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। এই সমস্যার সঙ্গে দেশের সবার একত্রিত হতে হবে।
আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাস মোকাবিলায় সেনাবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে সেখানে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বাড়াতে হবে। আমাদের আলোচনার শিরোনামে আমরা বলেছি সমস্যা সংকুল পার্বত্য চট্টগ্রাম। কিন্তু আমি এটাকে আগ্রাসনের মুখে পার্বত্য চট্টগ্রাম বলতে চাই। কারণ হচ্ছে, বিষয়টা কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা না, বরং এটা একটি ভূরাজনৈতিক আগ্রাসন। কাজেই যখন আমরা সমস্যার সমাধানের কথা বলব- বিষয়টা এমন না যে, অভ্যন্তরীণ অংশীজনরা আলোচনা করলেই সমাধান হয়ে যাবে। এটার সঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জড়িত। শান্তি বাহিনী ১৯৭৬ সালের আগে বাংলাদেশে কোনো আগ্রাসন চালায় নি। ফলে মনে হচ্ছে, ভারত একটি অস্ত্র হাতে রেখেছিল, যেটি সময় সুযোগ মতো ব্যবহার করছে। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। যে সময়ে ভারতের পছন্দের সরকার ক্ষমতায় থাকবে না, তখন তারা এই অস্ত্র ব্যবহার করবে। এই যে ভারতীয় আগ্রাসন এর সঙ্গে একটা স্থানীয় গোষ্ঠী জড়িত। তবে যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ তাদের কথা বলছি না। আমাদেরও একটা বড় রাজনৈতিক শক্তি এই ভারতীয় আগ্রাসনের সহযোগী। তার মধ্যে অন্যতম সহযোগী ছিলেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার সমর্থকরা। এটা বুঝতে না পারলে পুরো সমস্যা বোঝা যাবে না।
পার্বত্যনিউজের সম্পাদক ও সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান পলাশ বলেন, ‘রাষ্ট্রের সকল সুবিধা কেবলমাত্র শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী পাহাড়ে সাগরে জঙ্গলে গুহায় যেখানেই থাকুক সেখানেই ধ্বংস করতে হবে। এখানে একজন বক্তা বললেন আধিপত্যবাদী মনোভাব। এ আধিপত্যবাদী মনোভাব কারা দেখাচ্ছে। শান্তিচুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর দ্বারা ৫৪ শতাংশ বাঙালিদের অস্বীকার করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিয়ে যখন কথা বলি, তখন এটাকে শুধুমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। সেন্টমার্টিনে কিছু হলে সারাদেশ থেকে আমরা কথা বলি। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা যদি বাংলাদেশের সমস্যা হিসেবে দেখা হতো, তাহলে ১৮ কোটি মানুষ এই সমস্যা নিয়ে কথা বলত। রোহিঙ্গা সংকট যেমন কক্সবাজারের সমস্যা নয়, সমগ্র বাংলাদেশের সমস্যা। তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাও পুরো বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে। এই সমস্যা নিরসনে ঐক্যবদ্ধভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পাহাড়ের সমস্যার সমাধান করতে হলে সন্ত্রাস দমনে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। পাহাড় কিংবা জঙ্গল, সাগর কিংবা সমতলের গুহায় যেখানেই অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত তাদেরকে সেখানেই ধংস করতে হবে। রাষ্ট্রের সকল সুবিধা কেবলমাত্র শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য নিশ্চিত করতে হবে।
সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের সমন্বয়ক ইঞ্জিনিয়ার থোয়াইং চিং মং শাক বলেন, আমাদের যে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় আছে সেটাকে ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা মন্ত্রণালয়’ নামকরণ করা হোক। কারণ ক্ষুদ্র জাতিসত্তা শুধুমাত্র বান্দরবান, খাগড়াছড়ি কিংবা রাঙামাটিতে নয়, এটা সমতলের ময়মনসিংহে গাড়োরা আছেন, সাঁওতালরা আছেন, হাজংরা আছেন, মনিপুরীরা আছেন। তাদের জন্য কী আপনারা আলাদা মন্ত্রণালয় তৈরি করবেন। তাহলে আমি মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের পার্বত্য নাম মুছে দিয়ে ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা মন্ত্রণালয়’ করা হোক। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী, নৃগোষ্ঠী, সেটলার, সেটেলাম বাঙালি শব্দগুলো বাদ দিতে হবে। আপনারা ঢাকায় বসে বসে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন— পাহাড়ি বাঙালি বলেন, মানে কি? আপনিও পাহাড়ি, আমিও পাহাড়ি, যে পাহাড়ে বসবাস করে তারাই পাহাড়ি। আমরা কখনো বলিনি, আপনারা সমতলের বাঙালি, কেনো আমাদের আলাদা করে বলা হবে। আমাদের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান নামে বলা হোক। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিরসনে পাহাড়ের ১৪টি জাতিগোষ্ঠীর ভূমিহীনদের ভূমির বন্দোবস্ত করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা কেন্দ্রিক স্বপ্ন না দেখে সমস্ত জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। তবেই পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র বা পশ্চিমারা পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র করতে পারবে না।