নিজ দেশে চীনের তৈরি যুদ্ধবিমান থেকে বোমা ফেললো পাকিস্তান, নিহত ৩০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিমান হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। ভোর ২টার দিকে তিরাহ উপত্যকার একটি গ্রামে চীনে তৈরি জে-১৭ যুদ্ধবিমান থেকে ৮টি চীনা এলএস-৬ বোমা (লেজার-নিয়ন্ত্রিত নির্ভুল অস্ত্র) ফেলা হয়।

এই হত্যাকাণ্ড স্থানীয় মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। প্রদেশটিতে গত কয়েক বছরে বেড়ে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলার কারণে জনমনে আগেই অস্থিরতা ছিল। গত সপ্তাহে সোয়াত ভ্যালির মিংগোরা শহরে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে দ্রুত শান্তি ফিরিয়ে আনার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন।

এ ঘটনায় প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়েছে। দলের খাইবার শাখা এক্স-এ লিখেছে—“এই শোক ও বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। ড্রোন হামলা ও বোমাবর্ষণ ঘৃণার অসংখ্য বীজ বপন করেছে।” 

ঘটনাটি গোয়েন্দা তথ্যের মান ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের ধরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানা, যেখানে তারা সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছিল।

তবে সমালোচকেরা বারবার প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সরকারের অক্ষমতার কথা বলছেন। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নাগরিকদের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় ব্যর্থতা। 

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া শাখা জুন মাসে এক বিবৃতিতে বলেছিল, পাকিস্তান সরকারের “নাগরিক জীবনের প্রতি উদ্বেগজনক উদাসীনতা” আছে।

এর আগে মার্চ মাসে খাইবার প্রদেশের কাটলাং এলাকায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ১০ জন সাধারণ মানুষ নিহত হন। স্থানীয় সরকারের মুখপাত্র মোহাম্মদ সাঈফ জানান, গোয়েন্দা তথ্যে ওই এলাকা সন্ত্রাসীদের আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে জেনে অভিযান চালানো হয়েছিল। স্থানীয়রা নারী-শিশুসহ ১০টি লাশ উদ্ধার করেন।

কেন বিমান হামলা চালাল পাকিস্তান?

মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, লক্ষ্য ছিল তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর একটি বোমা তৈরির কারখানা। ইসলামাবাদ অভিযোগ করেছে, টিটিপি আফগানিস্তান থেকে পরিচালিত হয় এবং কাবুল সরকারের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র রয়েছে। তবে আফগান তালেবান এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

খাইবার পুলিশের দাবি, দুই টিটিপি কমান্ডার—আমান গুল ও মাসুদ খান গ্রামে বোমা তৈরির কার্যক্রম চালাচ্ছিল এবং সাধারণ মানুষকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছিল। তৈরি করা বোমাগুলো কাছের মসজিদে জমা রাখা হচ্ছিল।

হামলার দুই দিন আগে দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে টিটিপির হামলায় ১২ পাকিস্তানি সেনা নিহত ও ৪ জন আহত হন। এর দায় টিটিপি সামাজিক মাধ্যমে স্বীকার করেছে।

পাকিস্তান সরকার বলছে, আফগান তালেবান ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে খাইবার পাখতুনখোয়ায় টিটিপির প্রভাব অনেক বেড়েছে, আর এই হামলা ছিল সেটি ঠেকানোর প্রচেষ্টা।

খাইবার পাখতুনখোয়ার অবস্থান

দেশটির উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ এটি। পূর্ব-দক্ষিণে পাঞ্জাব, দক্ষিণে বেলুচিস্তান এবং উত্তরে গিলগিট-বালতিস্তান। পশ্চিমে রয়েছে আফগানিস্তানের সীমান্ত। রাজধানী পেশোয়ার ঐতিহাসিক খাইবার পাসের কাছে অবস্থিত। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি সন্ত্রাসীদের জন্য আদর্শ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত।

ইতিহাস

সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আগ্রাসন (১৯৭৯) সময় যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের আইএসআই-এর সহায়তায় প্রতিরোধযোদ্ধাদের অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে। যুদ্ধ শেষে এসব যোদ্ধা ও বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার খাইবার অঞ্চলে রয়ে যায়। পরবর্তীতে এখানেই গড়ে ওঠে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি।

২০০০-এর দশকের শেষ দিকে গঠিত হয় টিটিপি। পাকিস্তানের দাবি, এ গোষ্ঠী আফগানিস্তানে ঘাঁটি বানিয়ে সীমান্তের গোপন টানেল ও পথে পাকিস্তানে প্রবেশ করে হামলা চালায়।

বাড়তি সন্ত্রাসী কার্যক্রম

সম্প্রতি নিষিদ্ধ সংগঠন যেমন জইশ-ই-মোহাম্মদ ও হিজবুল মুজাহিদিনও খাইবারে নতুন ঘাঁটি গড়ছে। ভারতের ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর পর এসব গোষ্ঠী গভীর পাহাড়ি এলাকায় প্রশিক্ষণ শিবির চালু করেছে।

সূত্র: এনডিটিভি