সাব্বির আহমেদ।।
ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। বিএনপি সরকারে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। তার বাবা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় মীর হেলাল পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। সময়ের আলোকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা ও মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে আলাপ করেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাব্বির আহমেদ।পার্বত্যনিউজের পাঠকদের জন্য সময়ের আলোতে প্রকাশিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হল।সাব্বির আহমেদ : আপনার দায়িত্ব পাওয়ার শুরুতেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ‘পার্বত্য চুক্তি লঙ্ঘন’ করে প্রথম কোনো ‘অ-পাহাড়ি’কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে কথা উঠেছে। এ বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা কী?মীর হেলাল : আমি আসলে কাউকে কোনো বিশেষ ব্যাখ্যা দিইনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়তো বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু আমার মূল দায়িত্ব হচ্ছে কাজ করা এবং দায়িত্ব পালন করা। কে কী বলল, তার জবাব দেওয়াটা আমার প্রধান কাজ নয়। যদি আমার কাজ নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে- যেমন কেন আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিলাম তখন অবশ্যই তার ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। সরকার কেন আমাকে এখানে নিয়োগ দিয়েছে, সেটি সরকারই ভালো জানে এবং এটি সরকারের বিবেচ্য বিষয়। প্রশাসনিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত দুই দশকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় অন্তত আটজন বাঙালি বিভিন্ন সময় এই মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। উদাহরণ হিসেবে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া, লতিফুর রহমান, ফখরুদ্দিন আহমেদ, ড. মুহাম্মদ ইউনূস, মেজর জেনারেল রুহুল আলম চৌধুরী, ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী, মশহুদ চৌধুরীসহ আরও অনেকে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই বিষয়টি আসলে ব্যক্তি নয়। মূল বিষয় হলো এই অঞ্চলের সব মানুষের সমান উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। বিএনপির মূল লক্ষ্যই হচ্ছে একটি বৈষম্যহীন সমাজ। আমাদের ৩১ দফাতেও সেই লক্ষ্য ছিল। আমরা একটি রংধনু জাতি গঠন করতে চাই। যেখানে সব জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় সমান সুযোগ পাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে। বাঙালিসহ ১৪টি গোষ্ঠী বসবাস করে। আমাদের লক্ষ্য- সব গোষ্ঠীর মানুষ যেন সমানভাবে উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার আওতায় আসে। আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?বর্তমানে আমি দুটি বড় ঘাটতি দেখতে পাই। প্রথমটি হচ্ছে শিক্ষা। আমার মনে হয়, যেভাবে শিক্ষার আলো সেখানে পৌঁছানো দরকার ছিল, সেই মাত্রায় পৌঁছায়নি। দ্বিতীয় বিষয় হলো অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অভাব। এখানকার বেশিরভাগ মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছেন। পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নও প্রয়োজন রয়েছে বিশেষ করে সড়ক যোগাযোগ। যদি আমরা এই কয়েকটি ক্ষেত্রে উন্নতি করতে পারি- শিক্ষা, অর্থনীতির উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা তা হলে ওই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা উন্নত হবে। সমাজে যতবেশি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ে, ততই অন্ধকার সংকুচিত হয়। আমাদের লক্ষ্য পার্বত্য চট্টগ্রামের যে অন্ধকার অঞ্চল রয়েছে, সেগুলো যেন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে।পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ প্রাথমিক পর্যায়েই ঝরে পড়ে। এ বিষয়ে আপনারা কী পদক্ষেপ নেবেন?শিক্ষা সবার জন্য- এটি শুধু পার্বত্য অঞ্চল নয়, পুরো দেশের জন্য প্রযোজ্য। তবে এখানে অর্থনৈতিক বাস্তবতা একটি বড় কারণ। অনেক সময় দেখা যায়, পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে শিশুরা পড়া চালিয়ে যেতে পারে না। যত প্রণোদনাই দেওয়া হোক, পরিবার যদি আর্থিকভাবে সক্ষম না হয়, তা হলে শিশুকে স্কুলে রাখা কঠিন হয়ে যায়। তাই অর্থনৈতিক মুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবে, তখন শিক্ষার হার বাড়বে এবং ড্রপআউট কমে যাবে। বর্তমানে অনেক শিশু অল্প বয়সে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হতে হয়ে যায় এটি তাদের ইচ্ছা নয়, পারিবারিক প্রয়োজন। আমরা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি- যেমন হেলথ কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের একটি নিরাপত্তা নেটওয়ার্কে আনতে চাই। এতে ধীরে ধীরে তাদের আর্থিক অসচ্ছলতা কমবে।
বড় সমস্যা হলো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকা। এ জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। রাস্তা না থাকলে স্কুল বা হাসপাতাল তৈরি করাও কঠিন হয়ে যায়। যদি আমরা সড়ক যোগাযোগ উন্নত করতে পারি, তা হলে মানুষের যাতায়াত সহজ হবে, পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং স্কুল-হাসপাতাল নির্মাণও সহজ হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে আপনার মত কী?
বিষয়টি সরাসরি আমার বিভাগের অধীন নয়। এটি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিষয়- সংসদ, আইন মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। আমার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে উন্নয়নমূলক কাজগুলো দেখা। আমরা চেষ্টা করছি আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের মধ্যে থেকেই সর্বোচ্চ কাজ করার।
তরুণ মন্ত্রীদের মধ্যে আপনি অন্যতম। পার্বত্য অঞ্চলের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আপনার পরিকল্পনা কী?
আমাদের বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথমত আমরা এখানে একটি স্পোর্টস একাডেমি গড়ে তুলতে চাই। কারণ পার্বত্য অঞ্চলের ফুটবলাররা, বিশেষ করে নারীরা বাংলাদেশের জাতীয় দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমরা চাই তারা যেন নিজ এলাকায়ই প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়। এ জন্য একটি স্টেডিয়াম ও স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের সংস্কৃতিও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আমরা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তুলে এই সংস্কৃতি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে চাই।
সাব্বির আহমেদ : পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি বিরোধ দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ কী?
সরকারের অবশ্যই পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা চাই সবাই সমান অধিকার পাক এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে উঠুক। এই সমস্যার সমাধান সংলাপের মাধ্যমেই করতে হবে। কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হবে না। মানুষের সঙ্গে কথা বলে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি সংলাপই সব সমস্যা সমাধানের পথ।
সাব্বির আহমেদ : আগামী পাঁচ বছর পর পার্বত্য অঞ্চলকে কোথায় দেখতে চান?
আমি পাঁচ বছর নয়- তিন বছরের মধ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপমহাদেশের অন্যতম সেরা পর্যটন অঞ্চল হিসেবে দেখতে চাই। এটি হবে শান্তি, সম্প্রীতি এবং সৌহার্দের অনন্য উদাহরণ।
পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
শুধু পর্যটন নয়, এখানে কৃষি ও ফল উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে- রাবার শিল্পসহ কৃষি খাতও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রথম লক্ষ্য কৃষির আধুনিকায়ন, উৎপাদন বাড়ানো এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। অনেক ফল উৎপাদিত হলেও সংরক্ষণ বা পরিবহনের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। কোল্ড স্টোরেজ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করলে এই সমস্যা অনেকটাই কমবে। পর্যটনের ক্ষেত্রেও আমরা ইকো-ট্যুরিজমকে গুরুত্ব দেব। পাহাড় ও বনভূমির পরিবেশ নষ্ট করে কোনো ধরনের পর্যটন অনুমোদন দেওয়া হবে না।
পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?
আমাদের বার্তা খুবই সহজ। আমরা একটি রংধনু জাতি গঠন করতে চাই- যেখানে সব ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী ও মতের মানুষ একসঙ্গে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই লক্ষ্য অর্জনে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করি।