ইসলামাবাদ থেকে বিশেষ প্রতিনিধি:
পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের নাটकीय পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ক্ষমতার চাবি কাঠি যাদের হাতে, সেই শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং কারারুদ্ধ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে শুরু হয়েছে চরম গোপনীয় এক সমঝোতা বৈঠক। টানা তিন বছরের বন্দিজীবন এবং সেনাতন্ত্রের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতের পর, দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে এবারই প্রথম দু’পক্ষ এক টেবিলে বা তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য অবজারভার-এর সূত্র ধরে পাওয়া এই খবরের পেছনে রয়েছে পাকিস্তানের চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব। ২৬ কোটি মানুষের দেশে ইমরান খানের জনপ্রিয়তা কমার বদলে উল্টো সামরিক শক্তির ওপর জনরোষ বেড়েছে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতি টানা ছাড়া সেনাসদরের (GHQ) সামনে আর কোনো সহজ পথ খোলা নেই।
‘স্বাস্থ্যগত কারণ’: মুক্তির সেই পুরোনো ও নিরাপদ কৌশল
সমঝোতা আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে ৭৩ বছর বয়সী এই পিটিআই (PTI) সুপ্রিমোর ভঙ্গুর স্বাস্থ্যকে। কৌশলগত কারণেই এটিকে রাজনৈতিক সমঝোতা না দেখিয়ে “মানবিক বা চিকিৎসা সংক্রান্ত মুক্তি” হিসেবে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
- চোখের অস্ত্রোপচার ও শারীরিক অবনতি: চলতি বছরের শুরুর দিকে ইমরান খানের চোখে অস্ত্রোপচার হয়। পরবর্তীতে তাকে সম্পূর্ণ নির্জন কারাবাসে (Solitary Confinement) রেখে পরিবার ও চিকিৎসকদের থেকে বিচ্ছিন্ন করার পর থেকেই তার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটে।
- মৃত্যুর গুজব ও আন্তর্জাতিক চাপ: গত কয়েক মাসে তার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ থাকায় মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে, যা বিশ্বমঞ্চে পাক সরকারের ভাবমূর্তি গুঁড়িয়ে দেয়।
সন্তানদের নীরবতা ভাঙা ও পরিবারের আকুতি
লন্ডনে থাকা ইমরান খানের দুই ছেলে—সুলাইমান ও কাসিম খান যৌথ বিবৃতিতে নিজেদের ক্ষোভ ও আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছেন, “আমাদের বাবাকে সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। দীর্ঘ বন্দিদশায় তার শরীর ভেঙে পড়েছে বলে আমরা মারাত্মক আশঙ্কায় আছি।”
একই সুরে কথা বলেছেন ইমরানের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম উপদেষ্টা সৈয়দ জুলফি বুখারি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ভুলে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া এখন আর কোনো রাজনৈতিক দাবি নয়, সরকারের ন্যূনতম দায়িত্ব।
পর্দার আড়ালে কী ঘটছে?
পাকিস্তানের রাজনীতিতে সবসময়ই পর্দার পেছনের কলকাঠি নাড়ে রাওয়ালপিন্ডির জিএইচকিউ (GHQ)। সূত্রগুলো নিশ্চিত করছে যে, দেশের বর্তমান অচলবস্থা কাটাতে ইমরানকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দিয়ে বিদেশ পাঠানো বা গৃহবন্দি করার রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতিকে বাঁচাতে এই ‘ডেডলক’ ভাঙাই এখন দু’পক্ষের জন্য একমাত্র পথ। তিন বছরের লড়াই শেষে এখন দেখার বিষয়, আদিয়ালার নির্জন প্রকোষ্ঠ থেকে ইমরান খান ফের রাজপথের নেতৃত্ব নেবেন, নাকি সাময়িক রাজনৈতিক সমঝোতায় স্বাস্থ্য উদ্ধারে দেশের বাইরে পাড়ি জমাবেন।
