নিউজ ডেস্ক:
দুর্নীতি দমন কমিশনের নতুন করে পুনর্গঠনের পর আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিচার এখন সময়ের দাবি। সেজন্যে নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশনের শীর্ষ পদগুলো। কমিশন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও মূলত অনুসন্ধান ও তদন্তের মূল দায়িত্ব পালন করে কমিশনের মহাপরিচালক ও পরিচালকরা। তাদের তদারকিতেই দুর্নীতি বিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। নতুন কমিশন গঠনের পর পরিচালক মহাপরিচালক ও উপপরিচালক পর্যায়ে ব্যাপক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও দুদকের একাধিক সূত্র জানায়, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার থেকে মহাপরিচালক ও পরিচালক পদায়নের জন্য কিছু কর্মকর্তাকে নির্ধারণ করা হয়।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, গুরুত্বপূর্ণ দুদকের এই পদগুলোতে পদায়নের জন্য যাদের বাছাই করা হয়েছে- তাদের বিরুদ্ধেই বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে গুরুতর সব অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে করে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান বাঁধাগ্রস্ত হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আওয়ামী স্বৈরাচারী সরকারের দোসর, ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিশ্বস্ত, আওয়ামী সরকারের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত, ভিন্ন মতাবলম্বীদেরকে হয়রানি ও নির্যাতনের সাথে সম্পৃক্ত, ছাত্র-জনতার গণবিপ্লবে হত্যা-জখমে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী মোঃ জাকির হোসেন (৬৪৪৩), আবু হেনা মোস্তফা কামাল (৬৪৫০), ঈশিতা রানী (১৬০২৯) এবং এ কে এম সাইফুল ইসলাম (১৭১৮৭)-কে দুর্নীতি দমন কমিশনে পদায়নের প্রক্রিয়া চলছে। এরা সবাই চরম দুর্নীতিবাজ ও আওয়ামী স্বৈরাচারপন্থী দলবাজ। এসব দলবাজ ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি দমন কমিশনে পদায়ন করা হলে দুর্নীতি দমন কমিশন নিজেই দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হবে।
এদিকে, জুলাই-আগষ্ট কামান্ড কাউন্সিল নামে আন্দোলনরত ছাত্রদের একটি সংগঠন প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয় এক চিঠিতে কোনভাবেই মেনে নিবে না বলে জানিয়েছে। অবিলম্বে এসব দলবাজ-দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পদায়ন বন্ধ করতে আবেদন জানিয়েছে।
অভিযোগে জানা যায়, মো: জাকির হোসেন (৬৪৪৩), অতিরিক্ত সচিব (ওএসডি)। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে প্রত্যাহার করে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করেছে। বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৭ ব্যাচের এই কর্মকর্তার বাড়ি শরীয়তপুর জেলায়। পারিবারিকভাবে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক-এর ঘনিষ্টজন ছিলেন। ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত কর্মকর্তা চাকরি জীবনে আওয়ামী কানেকশন কাজে লাগিয়ে সকল সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। তিনি বিশেষ সুবিধার আওতায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলে কাজ করেছেন। একই ধারাবাহিকতায় ২০১৭-১৮ সালে তিনি ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক এবং ২০২৪ সালে এপ্রিল মাসে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি ২০১৯-২০২৪ পর্যন্ত দুদকের মহাপরিচালক হিসেবে ৪ বছর ৪ মাস চাকরি করেন। দুদকে চাকরির সময় ভিন্ন মতাবলম্বী কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানীমূলক মামলা দায়েরে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
গত জুলাই-আগষ্ট বিপ্লবে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন দমনে- তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন এবং তার নেতৃত্ব ও পরামর্শে রংপুরে ছাত্র-জনতা খুন হয়। এজন্য তার বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলাও হয়েছে। এই কর্মকর্তাকে দুদকে পদায়ন করা হলে অন্তর্বর্তী সরকারকে ছাত্র-জনতার সমালোচনার মুখে পড়তে হবে একজন স্বৈরাচারের দোসর খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করার কারণে। অপরদিকে তার বাধার কারণে পতিত সরকারের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে না।
আরেক সুবিধা ভুগি কর্মকর্তা হলেন- আবু হেনা মোস্তাফা জামান (৬৪৫০), অতিরিক্ত সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগ। বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৭ ব্যাচের এই কর্মকর্তা বিগত ৮ বছর যাবৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অনুবিভাগে কর্মরত আছেন। তাছাড়া তিনি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির একান্ত সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘদিন জননিরাপত্তা বিভাগে কর্মরত থেকে তিনি আওয়ামী নেতৃত্বের সান্নিধ্যে চলে আসেন। তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন, মোস্তাফিজুর রহমান ও জাহাঙ্গীর আলমের ঘনিষ্ট, যাদের সকলের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ আছে। আওয়ামী নেতা-কর্মীদের প্রতি এবং সাবেক দুর্নীতিবাজ আমলাদের প্রতি দুর্বলতার কারণে তাঁর পক্ষে পতিত সরকারের নেতা-কর্মী এবং পতিত সরকারের দোসর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে না।
ঈশিতা রনি (১৬০২৯), পরিচালক, দুদক। বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৫ ব্যাচের এই কর্মকর্তা টাঙ্গাইলে প্রবেশন পিরিয়ড ছাড়া আর কখনো মাঠ প্রশাসনে চাকরি করেননি। আওয়ামী ঘরনার অফিসার হওয়ার কারণে তিনি সচিবালয় কেন্দ্রিক পোস্টিং বাগিয়ে নিতে ছিলেন সিদ্ধ হস্ত। একই সুবিধা কাজে লাগিয়ে তিনি জেনভাস্থ ডব্লিউটিও মিশনে কাজ করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-২ শাখায় কাজ করার সময় তিনি একটি সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতাধর ধনঞ্জয় দাস, মোহাম্মদ হোসেন, আবুল ফজল মীরের চরম দুর্নীতিবাজ ও আওয়ামী পান্ডাদের ঘনিষ্ট থেকে অনেক অপকর্ম করেছেন। আওয়ামী কানেকশন আর ফ্যাসিস্ট সরকারের ক্ষমতাধর আমলাগোষ্ঠীর সাথে তার এখনো গোপন যোগাযোগ আছে। এমন কর্মকর্তার দুর্নীতি দমন কমিশনে পদায়ন বর্তমান সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে বাধাগ্রস্থ করবে।
এ. কে. এম. সাইফুল ইসলাম (১৭১৮৭)। বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ৩১ ব্যাচের এই কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ নেতা হাজী সেলিম এবং মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের ঘনিষ্ট। তিনি ২০২৪ এর ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাস্টারমাইন্ড সাবেক সচিব জাহাঙ্গীর আলমের অত্যন্ত ঘনিষ্ট এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও জননিরাপত্তা বিভাগে তার একান্ত সচিব ছিলেন। দুদক চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব হিসেবে তিনি তাঁর প্রভাব খাটিয়ে অনেক দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনৈতিক দুর্বত্তের বিরুদ্বে আইনী পদক্ষেপকে বাধাগ্রস্ত করবেন বলে আশঙঙ্কা করা হচ্ছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি ও আদর্শের পরিপন্থী, তথা গত জুলাই-আগষ্ট বিপ্লবের আদর্শের বিরোধী এই চার কর্মকর্তাকে দুদকে পদায়ন হলে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে না। আমরা এমন অনৈতিক পদায়নের তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং এসব পদায়ন বন্ধ করার নিমিত্ত সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। একই সঙ্গে প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা যে বা যারা এ সমস্ত পদায়নের পক্ষে কাজ করে তাদেরকে চিহিৃত পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাই।
সুত্র: বাংলাবাজার পত্রিকা
