মানবিক করিডোর: প্রক্সিওয়ার নাকি প্রতিবেশীর দায়

সাঈফ ইবনে রফিক, কবি ও সাংবাদিক

টেকনাফ-মংডু সীমান্তের অগভীর নাফ নদী বরাবর এখন উত্তরের হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে দু-রকম বার্তা। একদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাম্প্রতিক আলোচনায় উঠে-আসা ‘হিউম্যানিটারিয়ান করিডোর’—রাখাইনের জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার সুফল; অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু রাজনৈতিক বিবৃতিতে ভেসে-ওঠা আশঙ্কা—এটি কি আড়ালে কোনও ‘প্রক্সিওয়ারের’ দুয়ার খুলে দেবে? বিতর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রেস সচিব ব্যক্তিগত ফেসবুক-পোস্টে বিষয়টি সরাসরি খণ্ডন করতে বাধ্য হন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, “বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ কিংবা অন্য কারও সঙ্গে কোনো ‘মানবিক করিডোর’ নিয়ে আনুষ্ঠানিক সমঝোতায় যায়নি; কেবল লজিস্টিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকার মৌখিক অবস্থান জানিয়েছে।” সরকারি এই দৃঢ়-অস্বীকৃতি একদিকে গুজবের মেঘ সরায়, অন্যদিকে রাখাইন-সঙ্কট ঘিরে বাংলাদেশের কূটনীতি, নিরাপত্তা ও মানবিক দায়িত্ব নতুন ব্যাখ্যা দাবি করে।

কূটনৈতিক পটভূমি: ঢাকার ‘লো-প্রোফাইল অ্যাক্টিভিজম’

রাখাইন আজ বারুদের মতো অস্থির। মায়ানমারের সামরিক কাউন্সিলের সঙ্গে আরাকান আর্মির (এএ) প্রায় পূর্ণ-মুখী যুদ্ধ, আরসা-আরএসও-এর পারস্পরিক আক্রোশ ও সীমাহীন মাদকপথ মিলে অঞ্চলটিকে পরিণত করেছে জিলেটিন-মেশিনে। এই প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের প্রস্তাব—নৌ-সড়ক মিলিয়ে টেকনাফ-গুমধুম রুট ব্যবহার করে খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ—বিশ্বমঞ্চে যৌক্তিকও বটে। কিন্তু ঢাকা জানে, নাফ নদীর ভেজা বাতাসে ত্রাণ-কনভয়ের পাশে সর্বদা বাতাস করে বেড়ায় অস্ত্র-টুকরো আর ইয়াবার ধোঁয়া। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ২০১৭-র পর থেকে ইয়াবার মুলধারা আরসা ও আরএসও-র হাত ঘুরে কক্সবাজার ক্যাম্প থেকে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-হাটহাজারি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে; সম্প্রতি র‍্যাব-১১ আরসা প্রধান আতাউল্লাহ জুনুনিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করার সময় সেই নেটওয়ার্ক আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে । ফলে ঢাকা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ‘দরজা-খোলা’ কূটনীতি বজায় রাখলেও এখন পর্যন্ত কাগজে-কলমে কোনো করিডোর-চুক্তি সই করেনি।

সরকারের ব্যাখ্যা বনাম অপপ্রচার

প্রেস সচিবের পোস্টটি তিনটি স্তর স্পষ্ট করে:
এক, রাখাইন-ত্রাণে বাংলাদেশের ভূমিকা ‘সহকারী প্রতিবেশী’—সরবরাহের রুট খুলে দিতে পারে, কিন্তু ত্রাণের মালিকানা ও বিতরণ জাতিসংঘের;
দুই, এখনই কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি, কারণ অভ্যন্তরীণ অংশীজন—মন্ত্রণালয়, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, মাঠ প্রশাসন—সবাইকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার ধাপ বাকি;
তিন, “একটি প্রধান শক্তির ভূ-রাজনৈতিক কৌশল”–সংক্রান্ত খবর নিছক গুজব।

চলমান ডিজিনফরমেশন প্রবণতা অস্বীকার করা যায় না। গত কয়েক মাসে অনলাইন পোর্টালে চীনের ‘ম্যান্ডারিন করিডোর’, আবার কোথাও ‘ওয়াশিংটন-স্পন্সর্ড রিলিফ প্যাসেজ’—এমন ভিন্নমুখী কল্পকথা ঘুরেছে। গণমাধ্যম ফ্যাক্ট-চেক পরিষ্কার করেছে, রাখাইনে এখন পর্যন্ত কোনো বড় শক্তি প্রকাশ্যে অপারেটিভ অবকাঠামো বসায়নি; জাতিসংঘের জরুরি তহবিলও মূলত খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সীমিত ।

আরসা-আরএসও ও মাদকের ছায়া

তবু শঙ্কা সহজে মেটে না, কারণ সীমান্ত-সিন্ডিকেট বাস্তব। কক্সবাজার ক্যাম্পে আরসা-আরএসও-এর প্রভাব খোলামেলা; ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই বিজিবি এক কোটি ৭০ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করেছে, যার সিংহভাগ নাফ নদী দিয়ে আসে। জান্তা-এএ যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই ‘লুট-হয়ে-পাওয়া’ চীনা CQ-A রাইফেল, PF-৯৮ রকেট-লঞ্চার কিংবা M-২২হ্র রাইফেলের অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বাড়ছে। এএ সিৎও ও পালেটোয়া দখলের পর তাদের হাতে যে পরিমাণ অস্ত্র এসেছে, তার ক্ষুদ্র ভাগ কালোবাজারে বিক্রি হলেই আরসা-আরএসও-র অস্ত্রভাণ্ডার চাঙ্গা হতে পারে। ফলে স্ক্যানার, ডিজিটাল সিল ও জিও-ফেন্স সহ উচ্চ-ঝুঁকির পণ্য চিহ্নিত করতে না পারলে করিডোর মুহূর্তেই ‘সোনা-পথ’ হয়ে উঠবে।

আরাকান আর্মির ‘সহানুভূতি’ ও প্রক্সির দোলাচাল

আরাকান আর্মি নিজেকে রাখাইনের জাতিগত অধিকারের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরছে। বাংলাদেশি জেলে উদ্ধার করে বিজিবির কাছে হস্তান্তরের সাম্প্রতিক উদাহরণ তারা নিজ পরিভাষায় ‘গুডউইল জেশ्चर’ বলেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এএ স্বীকৃত করছে—করিডোর খোলা মানে তাদের রিয়ার লজিস্টিক কোভারের সুযোগ। চীনের চিয়াকফু-মহাপরিকল্পনায় এএ ‘ডি-ফ্যাক্টো সিকিউরিটি পার্টনার’; আর ভারত কালাদান মাল্টিমোডাল প্রকল্পে রাখাইনে প্রবেশ করতে চায়, তাই দিল্লিও এএ-কে পুরোপুরি দূরে সরাতে পারছে না। এই জটিল ত্রিভুজে ঢাকা যদি আনুষ্ঠানিকভাবে করিডোর চুক্তিতে সই করে, তবে আন্তর্জাতিক মেরুকরণের ছায়া তার কাঁধেও পড়বে—সেটিই প্রক্সিওয়ার আশঙ্কার কেন্দ্র।

নিরাপত্তা প্রস্তুতি: বিজিবির ‘থ্রি লেয়ার এয়ার-ওয়াল’

সরকারি অবস্থান স্পষ্ট: সিদ্ধান্ত যাই হোক, সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর সুরক্ষা ঢিলে হবে না। বিজিবি ইতিমধ্যে গুমধুম-থ্যাংখালি-রেজু চাপার লাইন ধরে সৌরচালিত সারভেইল্যান্স টাওয়ার, মিনি-রাডার ও ড্রোন-জামার বসিয়েছে; ভারতীয় প্রোপাগান্ডা মেশিনগুলো বলছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি হালকা পদাতিক কোম্পানি সহায়ক ইউনিট হিসেবে প্রস্তুত। গ্যান্ট্রি স্ক্যানার ও মোবাইল ভ্যান-স্ক্যানার কনভয়ের প্রতিটি ট্রাকে গামা-ইমেজিং করবে; ডিজিটাল সিল খুলে দিলে জিও-ফেন্স অ্যাপ ইমিডিয়েট-অ্যালার্ট পাঠাবে। ছয় মাস অন্তর আইএসও-ধরনের অস্ত্র-আবর্জনা টেস্ট আর কাইনাইন স্যুইপের শর্তও নিশ্চয়ই রাখবে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ।

মানবিক বাস্তবতা ও ঢাকার ‘কন্ডিশনাল এপ্রোচ’

মানবিক দৃষ্টিকোণেও করিডোর প্রয়োজন অস্বীকার করা মুশকিল। জাতিসংঘের হিসাবে শুধু ২০২৫-এর প্রথম তিন মাসে রাখাইনে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত; খাদ্যসংকট তীব্র। ঢাকার ভয়—এই চাপ নতুন ঢল তৈরি করলে নয় লাখের বেশি রোহিঙ্গায়-ঠাসা কক্সবাজার শিবিরগুলো অচল হয়ে পড়বে। ফলে বাংলাদেশ বলছে, “ত্রাণ হোক, কিন্তু প্রত্যাবাসন-গ্রাফে পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি দেখাও।” মালয়েশিয়ার আসন্ন আসিয়ান সভাপতিত্ব কাজে লাগিয়ে ঢাকা জোর দিচ্ছে ‘করিডোর-প্লাস-রেপ্যাট্রিয়েশন’ প্যাকেজে, যাতে ত্রাণ বাহকের প্রতিটি চাকা ঘুরতেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সার্বভৌম অধিকারটিও সমান্তরাল ঠাঁই পায়।

আশঙ্কা বাস্তব, কিন্তু গুজব নয়

সংক্ষেপে, সরকার যেহেতু কোনো ‘বাঁধা-চুক্তি’ সই করেনি, তাই “প্রধান শক্তি বাংলাদেশকে টেনে প্রক্সিওয়ারে নামাচ্ছে”—এমন প্রচার আপাতত ভিত্তিহীন। কিন্তু অস্ত্র-মাদক সিন্ডিকেট, আরসা-আরএসও রিক্রুটমেন্ট, এএ-র লজিস্টিক ‘পিগিব্যাক’ এবং বাণিজ্যিক লেনদেনের সম্ভাব্য ‘ডেড সার্কিট’—এসব ঝুঁকি একেবারে কাল্পনিক নয়; এগুলি ঘটতে পারে তবু ঠেকানোও সম্ভব, যদি সরকার ঘোষিত কন্ডিশনাল মডেল কঠোরভাবে প্রয়োগ করা যায়।

উপসংহার

প্রকৃত প্রশ্ন তাই আসলে দুটি। প্রথমটি—রাখাইন-ত্রাণপথ কি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে ঢাকাকে ‘নিরপেক্ষ সহায়ক’ থেকে ‘পক্ষপাতী প্রক্সি’তে রূপান্তর করতে পারে? সরকারি নথিতে এখনো তার কোনো ইঙ্গিত নেই। দ্বিতীয়টি—বাংলাদেশ কি প্রতিবেশীর মানবিক দায় এড়িয়ে থাকতে পারে, যখন নাফ নদীর অপর পারে শিশুরা অনাহারে? সে দায় নৈতিক-কূটনৈতিক দুইই। টেকনাফ-মংডু করিডোর যদি কখনও বাস্তবায়িত হয়, তবে সেটি দাঁড়াবে ‘সশস্ত্র নিরপেক্ষতার’ জটিল সেতুতে—যেখানে প্রতিটি স্ক্যানারের ছায়া, প্রতিটি চুক্তির টিকা আর প্রতিটি পুলিশি-ফার্স্টলাইনই ঠিক করবে, করিডোর শেষতক মানুষ বাঁচাবে, নাকি সীমান্তে নতুন বারুদের গন্ধ ছড়িয়ে দেবে। প্রশ্নের উত্তর এখনো খোলা, তবে সরকারি ভাষ্য স্পষ্ট–বাংলাদেশ মানবিকতার পাশে থেকেও নিজের সার্বভৌম নিরাপত্তা নিয়ে কোনও ‘টেস্ট কেস’ হতে রাজি নয়।