বিশেষ প্রতিবেদন: বান্দরবান পার্বত্য জেলায় সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নের নামে ৪৫ কোটি ১৬ লাখ টাকার সরকারি অর্থ লোপাটের এক নজিরবিহীন অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের মেয়াদের শুরুতেই কাগজে-কলমে কাজ ‘শতভাগ সম্পন্ন’ দেখিয়ে সমুদয় অর্থ তুলে নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে অধিকাংশ অবকাঠামোর কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই। পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও বিতর্কিত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর যৌথ সিন্ডিকেটে এ হরিণলুট সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নিয়ম ভেঙে ক্যাডার কর্মকর্তার ‘পিডি’ পদায়ন
প্রকৌশল সংক্রান্ত প্রকল্প হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসন ক্যাডারের ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. নজরুল ইসলামকে এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) করা হয়। একজন অ-প্রকৌশলী কর্মকর্তাকে কীভাবে কারিগরি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক ক্ষমতার দাপট ও মন্ত্রণালয়ে তদবিরের মাধ্যমে তিনি এই পদ হাসিল করেন। অন্যদিকে, উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) হিসেবে যুক্ত করা হয় বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিতর্কিত নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে-কে।
প্রকল্পের বরাদ্দ ও নির্ধারিত কাজের তালিকা
২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে বান্দরবানের সাতটি উপজেলায় (সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি) বাস্তবায়নের জন্য ৪৫ কোটি ১৬ লাখ টাকার এই বৃহৎ পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
- গভীর নলকূপ ও পাম্প: ১০টি নলকূপ, মিমি পাম্পসহ ৮৫টি গভীর নলকূপ এবং বিদ্যুৎ সংযোগসহ ৮৫টি পাম্প হাউজ।
- জিএফএস ও ওয়াটার হার্ভেস্টিং: ১২টি জিএফএস লাইন সংস্কার, ১০টি নতুন জিএফএস লাইন ও ১৪০টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা।
- অন্যান্য অবকাঠামো: ৩০টি পাবলিক টয়লেট, ৮৫ কিমি পাইপলাইন, ৮৫টি স্ট্যান্ড পোস্ট এবং ৫৮৩টি রিংওয়েল স্থাপন।
জালিয়াতির ধরণ ও দুর্নীতির চিত্র
- কাগজে-কলমে শতভাগ সম্পন্ন: সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে বরাদ্দের পুরোটাই তুলে নেওয়া হয়েছে। অথচ মাঠে অধিকাংশ কাজের চিহ্নও নেই।
- পুরোনো কাজ নতুন নামে চালিয়ে দেওয়া: বিভিন্ন এলাকায় আগের প্রজেক্টে করা রিংওয়েল বা নলকূপকে এই নতুন ৪৫ কোটির প্রকল্পের কাজ হিসেবে দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
- নিয়ম ভেঙে প্যাকেজ টুকরো করা: সরকারি ক্রয়বিধি (PPA/PPR) তোয়াক্কা না করে এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই মূল ৭টি ক্রয় প্যাকেজকে তড়িঘড়ি করে ৭৯টি ভাগে বিভক্ত করা হয়। এমনকি গণমাধ্যমে প্রচারের জন্য রাখা ৭ লাখ টাকার বরাদ্দ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
- অভিযোগ ওঠার পর প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা: সংবাদমাধ্যমে অনিয়মের খবর প্রকাশের পর দায় ঢাকতে তড়িঘড়ি করে কিছু এলাকায় লোকদেখানো কাজ শুরু করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
অভিযুক্তদের প্রতিক্রিয়া
প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকার এই আত্মসাতের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকল্প পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম এবং উপ-প্রকল্প পরিচালক অনুপম দে—উভয়ের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউই ফোন রিসিভ করেননি।
