ত্রিমুখী সংকটে ইরানের জনজীবন অতিষ্ঠ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

প্রতিদিন সকাল ৬টায় ঘুম ভাঙতেই সারা হাত বাড়ান তার ফোনের দিকে, তবে সেটি নোটিফিকেশন চেক করার জন্য নয়, বরং লোডশেডিং কখন শুরু হবে, তা দেখার জন্য।

৪৪ বছর বয়সী এই তেহরানের ডিজিটাল মার্কেটার সাপ্তাহিক লোডশেডিংয়ের সময়সূচি মুখস্থ করে ফেলেছেন। তবুও প্রতিদিন সকালে তিনি শেষ মুহূর্তের পরিবর্তন আছে কিনা তা যাচাই করেন, কারণ দুই ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘিরেই তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পরিকল্পনা সাজাতে হয়।

তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকলে গরম সহনীয় করার জন্য কোনো এয়ার কন্ডিশনার থাকে না।” ইরানের চলমান একাধিক সংকটের মুখোমুখি নাগরিকরা। এগুলোর মধ্যে পানি সংকট, বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং রেকর্ড তাপমাত্রা অন্যতম। কীভাবে তার জীবনযাত্রা বদলে দিয়েছে, সেটিই বর্ণনা করছিলেন সারা।

তার কথায়, পানির সেবা বন্ধ হয় কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই। একবার পানি সরবরাহ বন্ধ হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তা চালু হয় না। এ অনিশ্চয়তা সারাকে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করে। তাই তিনি চেষ্টা করেন যতবারই সম্ভব কল চলমান অবস্থায় বালতি ভর্তি করে রাখতে।

ইরানের আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি গ্রীষ্মে রেকর্ড তাপমাত্রার কারণে লাখো ইরানির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে। দেশটি একসঙ্গে পঞ্চম বছরের মতো খরার মুখোমুখি, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ঘাটতি আর নজিরবিহীন গরমে জর্জরিত, যা একসঙ্গে মিলে মূল সেবাখাতগুলোর ভঙ্গুরতা উন্মোচন করছে।

আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, চলতি জলবর্ষে (যা শরৎ থেকে শুরু হয়ে ১২ মাস ধরে) বৃষ্টিপাতের হার ৪০ শতাংশ কমে গেছে। ২৮ জুলাই পর্যন্ত দেশে গড় বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ১৩৭ মিলিমিটার, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি গড় ২২৮.২ মিলিমিটার।

এছাড়া বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও জ্বালানি সরবরাহ সমস্যা, যার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না।

ইরানি পার্লামেন্টের গবেষণা কেন্দ্রের অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের বিদ্যুতের ৮৫ শতাংশ আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে, ১৩ শতাংশ জলবিদ্যুৎ থেকে এবং বাকিটা নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক উৎস থেকে। যদিও ইরানের বিশাল তেল ও গ্যাস মজুত আছে, কিন্তু দশকের পর দশক ধরে আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগের ঘাটতি সিস্টেমকে চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে না। জ্বালানি সরবরাহের সংকটে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রকে প্রাকৃতিক গ্যাসের বদলে মাঝে মাঝে মাযুত (ভারী জ্বালানি তেল) ব্যবহার করতে হয়, কিন্তু বায়ুদূষণের কারণে কর্তৃপক্ষ সেটি সীমিত রাখার চেষ্টা করে।

গ্রীষ্মকালীন খরা জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দেয় ঠিক তখনই, যখন এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের চাহিদা চরমে পৌঁছায়, ফলে পূর্বনির্ধারিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও অঘোষিত পানিবন্ধের ওপর নির্ভর করেই জীবনযাপন করতে হচ্ছে লাখো ইরানিকে।

টিকে থাকার লড়াই

২৬ বছর বয়সী ফাতেমেহ এক বছর আগে রাজধানী তেহরান থেকে ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমের শহর আন্দিশে পড়াশোনার জন্য আসেন। প্রথমবারের মতো নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেয়া তার জন্য আনন্দের বিষয় ছিল, কিন্তু তা দ্রুতই পরিণত হয় প্রতিদিনের সংকট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতায়।

তার প্রথম অঘোষিত পানিবন্ধের সময় তাপমাত্রা বেড়ে গিয়েছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তিনি বলেন, “প্রথম কাজই ছিল কোনো নড়াচড়া বন্ধ করে দেওয়া, যাতে শরীরের তাপমাত্রা না বাড়ে।” মাত্র দুটি পানির বোতল ও এক ব্লক বরফ দিয়ে তিনি সতর্কভাবে মজুত ব্যবহার করছিলেন, যদিও মূল্যবান বরফের কিছুটা ব্যবহার করতে হয়েছিল পা ঠান্ডা করার জন্য। গোসল ও শৌচাগার ব্যবহার হয়ে উঠেছিল কঠিন কাজ। তিনি অনলাইনে দামী বোতলজাত পানি কিনে দুই বোতল শুধু গোসলের জন্য ব্যবহার করেছিলেন।

কয়েক মাসের অনিয়মিত সরবরাহের পর এখন ফাতেমেহর বেঁচে থাকার বিভিন্ন পাত্রে পানি জমিয়ে রাখা, বিদ্যুৎ গেলে তা বাষ্পীয় কুলারে ঢেলে দেয়া এবং চরম গরমে ভেন্টে বরফ ফেলার রুটিন তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, পানি ও বিদ্যুৎ দুটোই বন্ধ হয়ে গেলে “মনে হয় যেন জ্বর এসেছে”, তখন তিনি সংরক্ষিত পানি দিয়ে তোয়ালে ভিজিয়ে শরীরে চেপে ধরেন। বারান্দায় বের হলেও গরম থেকে মুক্তি নেই; রাতেও বাইরের বাতাস ঘরের চেয়ে বেশি গরম।

এই অবকাঠামোগত সংকট গৃহস্থালি অসুবিধার বাইরে গিয়ে অর্থনীতিকেও হুমকির মুখে ফেলছে। অফিস ও দোকানপাট ঘণ্টার পর ঘণ্টা কিংবা পুরোদিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়ছে এবং বহু পরিবার আয়ের উৎস হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেকের দোকানদারেরা ফ্রিজ নষ্ট হয়ে যাওয়া নষ্ট কেক ফেলে দেয়ার ভিডিও শেয়ার করছেন। দূর থেকে কাজের সমাধানও এখানে কার্যকর হচ্ছে না। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট দুটোই না থাকলে বাড়ি থেকে কাজ করা সম্ভব হয় না।

৩৮ বছর বয়সী সফটওয়্যার কোম্পানি ম্যানেজার শাহরাম বলেন, অনেক সময় তাকে কর্মীদের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হয়। “বিদ্যুৎ সাধারণত দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে হয়ে থাকে। যদি ২টা, ৩টা বা ৪টায় বিদ্যুৎ চলে যায়, আমি সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিই, কারণ বিদ্যুৎ ফেরার আগেই কাজের সময় শেষ হয়ে যায়।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংকটের পেছনে মূল কারণ অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে ব্যর্থতা, যা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং অস্থিতিশীল ভোগব্যবস্থা।

জলসম্পদ গবেষক ও ‘তাদবির-এ-আবে ইরান’ থিঙ্ক ট্যাংকের কৌশলগত পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ আর্শাদি বলেন, ইরানের পানি সংকট মোকাবেলায় ভোগব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। প্রাকৃতিক ঘাটতি জলবায়ু পরিবর্তনে বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু তার মতে মূল সমস্যা হলো দেশের পানি ব্যবহারের ধরন। পানি-নিবিড় কৃষি, বৃহৎ শিল্প এবং নগরায়ণের বিস্তার “পানির চাহিদার লাগামছাড়া বৃদ্ধিকে” উসকে দিয়েছে।

সূত্র : আল জাজিরা